সুশিক্ষিত
" সামনের রোডের যে অবস্থা! ধাক্কা আসলেই আপনি তো পড়ে যাবেন ভাইয়া, আরো একটু এগিয়ে বসুন।"
"থাক আপা। আপনার সমস্যা হইতে পারে, আপনারা শিক্ষিত মানুষ আমি সামান্য ঝালমুড়ি বিক্রেতা। গতর দিয়া গন্ধ আহে, আমি এমনেই আমি ঠিক আছি।"
"আরে সমস্যা নেই। আপনি ঝালমুড়ি বিক্রেতা তাই বলে নিজেকে ছোট ভাববেন না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা সবাই মানুষ। আমরা সবাই সবার জায়গা থেকে দামী।"
"আপা আমাগো মতো অশিক্ষিত ফুটপাতের সামান্য মানুষগো কেউ দাম দেয় না। অনেকে তো ভুলেই যায় আমরাও মানুষ। "
ভাইয়ার সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম উনার নাম রহিত। আমাদের পাশের গ্রামেই থাকেন। এরিমধ্যে পাশের মোড় থেকে বাসে একটা মেয়ে উঠেছে। বাসের সব সিট বুকিং, সবাইই ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কেউ নিজের সিট ছাড়তে নারাজ।
মেয়েটা জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা রাস্তা,বাসের ধাক্কায় মেয়েটার শরীর দুলছে যা কিছু পুরুষ বি'শ্রী ভাবে উপভোগ করছে। হঠাৎ করে রহিত ভাইয়া নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে মেয়েটাকে বসতে দিলো। বাসে ভার্সিটিতে পড়ুয়া অনেক শিক্ষিত ছেলেও ছিলো কিন্তু কেউ এই কাজটি করেনি। সারাটা পথ উনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই রইল। মেয়েদের প্রতি উনার এমন অগাধ সম্মান দেখে মুগ্ধ হলাম আমি। এই জেনারেশনে সচারাচর এমনটা দেখা যায় না। উনার সাথে আর কথা হয়নি।
বাস এসে নিজের গন্তব্য থামলো, আমি সামনের দিকের সিটে থাকায় তাড়াহুড়ো করে নাম ছিলাম। এরিমধ্যে পিছনের সিটের ছেলেগুলো আমাকে দেখে হাসছে, কানাঘুষা করছে। হঠাৎ করে খেয়াল করে দেখলাম আমার পাজামা বেঁধ করে জামায় পিরিয়ডের র'ক্তে'র দাগ বসে গিয়েছে। এটা দেখেই লোকজন হাসছে, এদের সাথে কিছু মেয়েও মজা নিচ্ছে। জন সম্মুক্ষে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম আমি। এরিমধ্যে পাশ থেকে আমার ক্লাসমেট জাহিদ হেসে বললো,
"রাফা! লাল সীলে তোর পিছনটা তো সেই সুন্দর লাগছে! সো হ'ট!"
আমি সেসব শুনেও না শোনার ভান করে দ্রুত বাস থেকে নেমে রাস্তার কিনারায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এখনো বড় একটা রোড পাড়ি দেওয়া বাকি। এমন অবস্থায় কি করে যাবো। তান্মধ্যে, আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন রহিত ভাইয়া। নিজের পড়নের শার্টটা আমাকে খুলে দিয়ে বললেন,
" আমার এই শার্ট'টা খুব শখের ছিলো! আম্মার দেওয়া শেষ স্মৃতি! আপনার এই বিপদে এটা দিতে বাধ্য হলাম। শার্টা কোমড়ে বেঁধে নিন আপা। এসব পবিত্র জিনিস! এটা নিয়া লজ্জা পাইবেন না।"
আমি বিনাবাক্যে ততক্ষণাৎ সেটাই করলাম। উনার দিকে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকিয়ে বললাম,
"আপনি ভীষণ ভালো মানুষ ভাইয়া। এতো শিক্ষিত লোকের ভিতর থেকেও আপনি রিয়েল হিরো!"
উনি এক গাল হেসে বললো, "ভালো মানুষ কি-না জানি না। আমার আম্মা আমাকে অভাবের তাড়নায় পড়ালেখা শিখাইবার না পারলেও মেয়েদের কেমনে সম্মান করতে হয় তা শিখাইছে। আপনার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে এটাই করতাম। এহন যাই আপা, ভালো থাকবেন।"
ভাইয়া মুচকি একটি হাসি দিয়ে চলে গেলো। আমি উনার যাওয়ার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। বড়বড় শিক্ষিত লোকও এই ঝালমুড়ি বিক্রেতার শিক্ষার কাছে হার মানে। আমরা অনেকেই এদের হেয় করে দেখি। মূলত এরাই মানুষের কোনো বিপদ-আপদে সবার আগে এগিয়ে আসে।
আমাদের সমাজে অনেক উচ্চ শিক্ষিত পুরুষ থাকলেও সুশিক্ষিত পুরুষের সংখ্যা খুবই নগন্য। যে পুরুষ রাস্তা ঘাটে চলার পথে মেয়েদের সম্মান করে, এরাই কোনো আদর্শ মায়ের সুশিক্ষিত সন্তান। তাদের জন্য মন থেকেই আপনা-আপনি সম্মান চলে আসে৷ নিঃসন্দেহে সেই সমস্ত পুরুষ হাসবেন্ড ম্যাটারিয়াল। এই সমস্ত পুরুষদের স্যালুট! ভাইয়া আপনাকে স্যালুট!
(সমাপ্ত)
ছোটগল্প ঃ #সুশিক্ষিত
C.সুমাইয়া আফরিন ঐশী
